“একটি শব্দ, এক পৃথিবী”
ফরমের সেই ঘরটায় এসে কলমটা থমকে গেল… ‘পিতা’র নাম লেখার জায়গা। কতবার এই নামটা লিখেছি—স্কুলের ফরমে, পরীক্ষার প্রবেশপত্রে, ব্যাংকের কাগজে, চাকরির দরখাস্তে। প্রতিবার নামটা লিখতে গিয়ে মনে হতো, এই নামের সঙ্গেই তো আমার পরিচয়, আমার অস্তিত্বের শেকড়। কিন্তু আজ প্রথমবার নামের পাশে লিখতে হচ্ছে ‘মৃত’।
কলমটা যেন নাম লিখতে চায় না। হাত কাঁপে। বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে একটা শূন্যতা। মনে হয়, বাবাকে দ্বিতীয়বার হারাচ্ছি—কাগজের পাতায়। যেন একটা ছোট্ট শব্দ আমার পুরো পৃথিবীকে পাল্টে দিচ্ছে।
আগে বাবার নাম লিখতে গর্ব হতো, আনন্দ হতো। ছোটবেলায় স্কুলে ফরম পূরণের সময় বাবা পাশে বসতেন। বলতেন, “দেখ, হাতের লেখা সুন্দর করে লিখতে হবে। পিতার নামের জায়গাটা কিন্তু কখনও ভুল কোরো না।” আমি হাসতাম, মনের আনন্দে লিখতাম বাবার নাম। আমার জীবনের সবচেয়ে নির্ভরতার নাম।
কিন্তু আজ! আজ কলমটা যেন আমার হাতেই নেই। তার ভারটা যেন আমি বইতে পারছি না। “মৃত”—মাত্র একটি শব্দ, কিন্তু তার ওজন আমার হৃদয়ের পুরো অনুভূতির চেয়ে বেশি হয়ে গেছে।
বাবার সঙ্গে কাটানো দিনগুলো
বাবা ছিলেন আমার জীবনের প্রথম শিক্ষক। ছোটবেলায় রাতে ঘুমানোর আগে গল্প শোনাতেন। কখনো রাজা-রানির গল্প, কখনো মুক্তিযুদ্ধের সাহসী বীরদের কথা। আমি অবাক হয়ে শুনতাম। তাঁর কণ্ঠে ছিল আশ্চর্য মায়া, একটা ভরসার আবরণ। মনে হতো, যতক্ষণ তিনি পাশে আছেন, কোনো ভয় নেই।
স্কুলে যাওয়ার সময় বাবার হাত ধরে হাঁটতাম। পথের ধারে কোনো কিছু দেখিয়ে বলতেন, “দেখো, এই গাছটা কত বড় হলো, কিন্তু একদিন এটি ছোট চারাগাছ ছিল। মানুষের জীবনও ঠিক তেমন।” বাবা সবকিছুকে শেখানোর উপকরণ বানিয়ে ফেলতেন। তাঁর শেখানো কথাগুলো একেকটা ছোট ছোট আলো হয়ে আমার মনের মধ্যে আজও জ্বলছে।
বড় হওয়ার পরও বাবার সঙ্গে কাটানো সময়গুলো ছিল অমূল্য। পরীক্ষার আগের রাতে, আমি যখন ঘুমাতে পারতাম না, বাবা এসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন। বলতেন, “ঘুমিয়ে পড়ো, কাল সব ঠিক হয়ে যাবে।” কী আশ্চর্য! সত্যিই সব ঠিক হয়ে যেত। কারণ বাবার আশ্বাসের চেয়ে শক্তিশালী কিছু ছিল না আমার জীবনে।
শেষ দিনগুলো
জীবনে কখনো ভাবিনি, বাবাকে এভাবে হারাব। বাবা অসুস্থ হওয়ার পরও বলতেন, “আমি ঠিক আছি। চিন্তা কোরো না।” কিন্তু আমি জানতাম, তিনি আর আগের মতো নেই। হাসপাতালে যখন তাঁকে নিয়ে যাওয়া হলো, আমি ভেবেছিলাম, কয়েকদিনের মধ্যেই সুস্থ হয়ে ফিরবেন। কিন্তু নিয়তি ভিন্ন কিছু লিখে রেখেছিল।
আমি যখন বাবার নিথর শরীরের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম, তখনো বিশ্বাস হচ্ছিল না। আমি চাইছিলাম, কেউ এসে বলুক, “ভুল হয়েছে, উনি ঠিক আছেন।” কিন্তু কেউ বলল না। ডাক্তার এসে কেবল একটা কাগজ এগিয়ে দিলেন। বাবার নাম লেখা ছিল সেখানে, পাশে একটা তারিখ—যেদিন তিনি এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন।
আমি সে রাতে বাবার হাত ধরেছিলাম, কিন্তু কোনো উষ্ণতা পাইনি। যাঁর হাত ধরে একদিন হাঁটতে শিখেছিলাম, যিনি আমাকে শক্ত হয়ে দাঁড়াতে শিখিয়েছিলেন, তাঁর হাত এখন শীতল। সেই মুহূর্তে মনে হলো, আমি জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়টুকু হারিয়ে ফেলেছি।
“মৃত” শব্দের ভার
আজ এই ফরমের সামনে বসে আমি বাবাকে আবার হারাচ্ছি। কাগজের পাতায় যখন লিখতে হয় ‘মৃত’, তখন মনে হয়, আমি নিজেকে লিখছি। কারণ বাবার নামের পাশে এই শব্দ বসানো মানে আমার জীবনের একটা বড় অংশ মুছে যাওয়া।
আমি কলম তুললাম। কিন্তু হাত কাঁপছিল। লিখতে পারছিলাম না। মনে হলো, একবার নামটা লিখলে আর কখনো মুছতে পারব না। এই শব্দটা চিরদিনের জন্য থেকে যাবে। আমি আর কখনো বাবাকে ফিরে পাব না।
তবু নিয়ম মানতে হয়। সমাজ, জীবন, অফিসের নিয়ম মেনে আমাকে এই সত্য মেনে নিতে হবে। বাবার নামের পাশে থেমে থাকা কলমটা ধীরে ধীরে লিখল সেই কঠিন সত্য—‘মৃত’।
চোখের কোণে জল জমে উঠল। বাবার কথা খুব মনে পড়ছে আজ…
আমি জানি, এই শব্দটা শুধুই একটা আনুষ্ঠানিকতা, কিন্তু আমার হৃদয়ের জন্য এটা বিশাল এক ধাক্কা। কাগজের পাতায় একটি শব্দ লিখে দিলেই কি সত্যি কেউ মরে যায়? বাবার স্মৃতি, তাঁর ভালোবাসা, তাঁর শিক্ষা কি মরে গেছে?
না, বাবা আছেন। আমি যখন কথা বলি, যখন জীবন নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিই, যখন বিপদে পড়লে মাথার ভেতরে বাবার কণ্ঠস্বর শুনতে পাই—তখন বুঝি, বাবা আছেন।
এই পৃথিবীতে কেউ কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। আমরা যাঁদের ভালোবাসি, তাঁরা থেকে যান আমাদের মনে, আমাদের চিন্তায়, আমাদের প্রতিটি সিদ্ধান্তের ভেতরে।
আজ আমি বাবার নামের পাশে “মৃত” লিখেছি, কিন্তু আমার হৃদয়ে তিনি চিরঞ্জীব। বাবার হাত আর ধরতে পারব না, কিন্তু তাঁর শেখানো কথাগুলো ধরে আমি চলব, যতদিন বেঁচে থাকি…